গল্প: মরাখলা খাল (পর্ব: ১ম পর্ব) ভৌতিক ঘঠনা অবলম্বনে একটি খালের সহস্য

বিশাল বড় এই মাছটা হা করতেই আমাদের সব কয়টা নৌকা মাছটার মুখের ভিতর দিয়ে ঢুকে পড়লো।
আমরা জোরে চিৎকার করছি কিন্তু আমাদের চিৎকার হয়তো কেউ শুনতে পাচ্ছে না। অমৃতা খুব জোরে- জোরে চিৎকার করছে কিন্তু কেউই আমাদের সাহায্য করছে না কেন। খালের সমস্ত পানি যেন দশ হাত উপরে উঠে পরেছে।
আর হয়তো আমাদের আওয়াজ কেউ শুনতে পাচ্ছে না। কিন্তু এত জোরে আওয়াজের শব্দ তো সবার কানে যাওয়ার কথা ছিল তো এরকম কেন হচ্ছে? আমি কিছুই বুঝতেছি না। সমস্ত শরীর থেকে ঘাম ভেয়ে পরছে। আমরা চারজন চার থেকে হারিয়ে গেলাম মনে হচ্ছিল কোনো এক নতুন শহরে ডুকে পরলাম। যেখানে শুধুই মাছের রাজাত্ব।

যাক তাহলে এখন গল্পটা শুরু করি। আমি রনি, আমার বয়স ২১, আমি বড় হয়েছি শহরেই তবে আমার ছোটবেলাটা কেটেছে গ্রামের বাড়িতে, খুব আনন্দে উল্লাসে আমার ছোটবেলাটা কেটেছে। আমি ওই সময়টাকে খুব মিস করতাম। আর আমার গ্রামটাকে আমি খুবই ভালোবাসি। পড়াশোনার ফাঁকে একটু সময় পেলেই আমি ছুটে যাই আমার সেই প্রাণপ্রিয় গ্রামের বাড়িতে, আমার ভালো লাগে সবার সাথে দেখা করতে, একসঙ্গে খেলা করতে। তবে এবারে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার বিষয়টা ছিল খুবই অন্যরকম যেটা আমাকে সারাক্ষণ মনের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করতে থাকে। আমার বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি ছোট খাল। খালটির নাম ছিল মরাখলা খাল। খালটা এতটা ছোট নয় তবে কিছুটা সামনে গিয়েই একটা নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর সেই নদীর নাম হচ্ছে মরা নদী।

আসলে নামগুলো শুনে একটু অদ্ভুত হবারই কথা। হ্যাঁ এই নাম গুলোর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে, যেটা ঠিকমতো আমারও জানা নেই তবে হ্যাঁ এই গল্পের মধ্যে আমরা এইসব কাহিনী জানবো। তবে আমি যতটুকু জানি আমাদের বাড়ির পিছনে যে খালটা বয়ে গিয়েছে সেটাতে নাকি নিশি রাতে ওখান দিয়ে যদি কেউ মাছ ধরতে যায় তাহলে নাকি আর তাকে জীবিত ফিরে পাওয়া যায় না। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে ওই হারানো লোকটাকে নাকি পাওয়া যায় ওই নদীতে মানে ওই মরা নদীতে। এভাবে অনেক মানুষের জীবন হারিয়েছে এই খালের মধ্যে আর এই নদীতে পাওয়া গেছে লাশ। তাই এই খাল এবং নদীর এই অদ্ভুত নাম দেওয়া হয়েছে।

আমাদের গ্রামের লোকজনেরা এই খালের সামনের দিক তাতে একটা সাইন বোর্ডে লিখে রেখেছে, “রাত্রেবেলা এইখানে প্রবেশ নিষেধ” কিন্তু বড়ই অদ্ভুত ব্যাপার হলো যখন রাত্রি হয় তখন এই সাইনবোর্ডের লেখাটা পাল্টে যায়। তখন লেখা থাকে “এখানে প্রবেশ করুন” আর ওই খালের উপর দিয়ে রাতের বেলা খুব কম মানুষই যায়।

রাত্রেবেলা ওই নদী থেকে শব্দ ভেসে আসে, কারো কান্নার, কারো জোরে-জোরে হাসি শব্দ, আর চিৎকারের শব্দ এবং দূর থেকে দেখা যায় সেখানে অনেক মানুষের ভিড়, কিন্তু কয়েকজন মিলে যখন ওই নদীর পারে যায় ওই মানুষ গুলো দেখতে তখন গিয়ে দেখে ওখানে কিছুই নাই সব নিরব শান্ত পরিবেশ। তবে খুব অদ্ভুত ব্যাপার হল ওই নদীতে প্রতি মাসে কমপক্ষে দুটো করে লাশ পাওয়া যায় এবং লাশগুলোর অবস্থা খুবই ক্ষত বিক্ষত থাকে, কারো নাক, মুখ, বডিতে এমন ভাবেই আঘাত করা হয় যেন লাশটা কার সেটাই চেনা যায় না। আর অনেক সময় নাকি দেখা যায় অনেক লাশের হাত পা থাকে না, থাকে না মাথাও, কি অদ্ভুত ব্যাপার এগুলো শুনলে আমার খুবই হাসি পায় আমি একদমই এই সমস্ত ভুত-প্রেত বিশ্বাস করি না।

যদিও আমি এই সমস্ত কখনো দেখিনি তারপরও আমার এগুলো দেখার খুব ইচ্ছা। এ সমস্ত’কে আমি খুব মজাদার হিসেবে ভেবে নেই, আসলে শহরে তো একাকীত্ব থাকার কোন উপায় নেই সেজন্য হয়তো এসবের সাথে দেখা মিটে নি।

যাক এবারে মূল গল্পে চলে আসি। এবারে আমার গ্রামের বাড়িতে আসার কারণ হলো মাছ ধরবো বলে। গ্রাম থেকে আমার এক বন্ধু ফোন দিয়ে বললো গ্রামে যেতে। গ্রামে নাকি প্রচুর মাছ ধরা হচ্ছে সেও নাকি অনেক মাছ ধরতেছে এবং আমাকেও আমন্ত্রণ করলো। আমি ভাবলাম যাক বিষয়টাতে তো অনেক মজা হবে। এবার না হয় মাছ ধরার জন্যই গ্রামে যাবো।

মাছ ধরার বিষয়টা আমি আমার এক বান্ধবীর সাথে শেয়ার করলাম। তখন সে বললো তারও নাকি জোসনা রাতে মাছ ধরার খুব ইচ্ছা। আমাকে খুব আকুতি মিনতি করে বললো তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি বললাম শোন তুই তো একটা মেয়ে, তোকে আমি ওখানে নিয়ে গিয়ে কিভাবেই মাছ ধরবো। আর তুই তো মাছ ধরতে পারিস না। তখন সে বললো: না মাছ ধরতে পারি না কিন্তু তোদের সঙ্গে থেকে মাছ ধরা আমি শিখবো আর আমি তাদেরকে সাহায্য করবো। আমি তাকে অনেক ভয় দেখালাম কিন্তু সে যাবেই। আমি প্রথমে রাজী হলাম না পরে এতো অনুরোধের পরে কি আর থাকা যায়। যাক সাথে নিয়ে নিলাম তাকেও।

ওর নাম অমৃতা আর গ্রামে আমার দুই জন বন্ধু আছে। তাদের এক জনের নাম রিজমান আরেকজনের নাম রিফাত আর আমি রনি।। ওরা খুব সাহসী ছেলে রাতের বেলায় ওরা একা-একা হাঁটাহাঁটি করতে পারে এমনকি ওরা ওই খালের পাড়ে বসে নাকি খেলাধুলাও করে।

সবকিছু ম্যানেজ করে আমি আর আমার বেস্ট ফ্রেন্ড অমৃতা ছুটে চললাম গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

সকল বাধা পার করে অবশেষে আমরা পৌঁছে গেলাম। গ্রামে প্রবেশ করেই বুঝলাম অনেকদিন যাবৎ বৃষ্টি হচ্ছে এবং চারপাশটা ঘুরে দেখলাম শুধু পানি আর পানি। যাক তাহলে এবারে খুবই মজা হবে। আমার বান্ধবী অমৃতা সে তো বেজায় খুশি এরকম একটা জায়গা সে আসতে পেরে। সারাদিনই আমরা ঘোরাফেরা করলাম, অনেকদিন ঢাকায় থেকে কেমন যেন বিরক্ত অনুভব করছিলাম আর এখন একটু খোলা বাতাস আর চতুর্দিকে পানির গর্জন শুনতে পেয়ে খুবই ভালো লাগছে। যেন প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে একাকার হয়ে গিয়েছি।

আমার গ্রামের বন্ধুরা আমাদেরকে পেয়ে খুবই খুশি হলো। সারাদিন খুব আনন্দে কাটলো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে আর আমাদের মাছ ধরার সময় এসে গেছে।
রাতটা ছিল নিঝুম অন্ধকার আকাশটা কেমন যেন মেঘলা আর চারপাশ যেন নিস্তব্ধ আর চতুর্দিক থেকে শুধুই পানির শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমাদের বাড়ির পিছনে যে খালটা আছে সেটা এখন পুরোপুরি পানি দিয়ে ভর্তি আর পানির স্রোত এতটাই যে, আমি যদি সেখানে দাঁড়াই তাহলে হয়তো আমাকেও ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

যাক আমরা চারজন মিলে একটা পরিকল্পনা করলাম। নৌকা দিয়ে রাত্রের বেলা মাছ ধরার। আমার ওই দুজন বন্ধু আমাদের জন্য ছোট্ট-ছোট্ট চারটা নৌকা নিয়ে আসলো। কেন জানি বাসা থেকে মা বাবা এমনকি সবাই না করছে এই রাতে যেতে কিন্তু আমার মন একদমই মানছে না। যার জন্য আমরা ঢাকা থেকে এখানে আসলাম সেটাই যদি না করতে পারি তাহলে কি করে হবে। অমৃতা তো মাছ ধরার জন্য ছটফট করতেছে, সবার অমতেই আমরা বেরিয়ে পরলাম চারজন চারটা নৌকা নিয়ে সাথে করে নেওয়া হয়েছে আরও অনেক মাছ ধরার যন্ত্রপাতি।

আমার সাথে নিয়েছি একটা মাছ ধরার কোঁচ, আর একটা পোলো এবং একটি জাল। ঠিক ঐরকম ভাবে অমৃতাকেও এগুলো দেওয়া হয়েছে। তবে অমৃতা মাছ ধরতে পারে কিনা সন্দেহ আছে। যাই হোক না কেন আমাদের সাথে থাকবে এটাই সে চায়।

এখন রাত সাড়ে নয়টা বাজে। আমরা একে-একে রওনা শুরু করলাম আমাদের বাড়ির পিছনে মরা খলা খালের দিকে। আমি বারবার জাল ফেলতে থাকি কিন্তু
কোনো মাছ পাচ্ছি না। অনেকক্ষণ জাল ফেলার পর বিরতি নিলাম। এবার দেখি ওরা কেমন মাছ ধরেছে। আমি তো পারলামই না, তবে দেখলাম অমৃতা চারটা মাছ পেয়ে গেছে, কি অবাক কান্ড সে কি করে এতো মাছ পেয়ে গেলো!! সে তো মাছ ধরতে জানে না। তখনি বললাম, কিরে তুই এত মাছ কি করে পেলি।
ও হাসতে থাকে আর বললো কেন আমার কাছ থেকে শিখে নেয় কেমনে মাছ ধরতে হয়। অনেক তো বলেছিলি যে আমি পারি না, পারি না এখন বুঝতে পারছিস বলেই হাসতে থাকলো। আর আমার রাগে গাল ফুলে যাচ্ছে।

তারপরে আমি আমার দুজন বন্ধুকে বললাম তারা কি মাছ পেয়েছিস ওরা বললো ওরা ও মাছ পেয়েছে তাহলে আমারই কপাল খারাপ। আমরা আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
এই অন্ধকার নিস্তব্ধ পরিবেশে আমাদের আশেপাশে কেউ নেই আমরা চারজন ছাড়া শুনশান পরিবেশ যেন নিস্তব্ধ মানব শূন্য। আমি সবার সামনে নৌকা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি পিছনে অমৃতা তার পেছনে আর আমার ওই দুই বন্ধুরা।

আমরা আনন্দ করতে থাকলাম আর সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমার খুব কষ্ট লাগছে এখনো একটা মাছ ও পাচ্ছি না। ঠিক ঐ সমস্ত চিন্তা করার সময়ই আমার নৌকাটা হালকা করে একটা কিসের সঙ্গে যেন একটা ধাক্কা খেলো।
মনে হলো কোন পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছি কিন্তু না এই খালেতো কোন বড় পাথর নেই। আমি অত চিন্তা করলাম না, তবে জিনিসটা কি হতে পারে আমি আশপাশে ভালো করে দেখতে লাগলাম। অনেক খোঁজাখুঁজি করার পরে দেখতে পেলাম একটা বিশাল বড় মাছ। আমি এত বড় মাছ দেখে সত্যিই অবাক হয়ে গিলাম। এত বড় মাছ আমি আমার জন্মেও দেখিনি। মাছটা আমারই নৌকায় ধাক্কা দিয়ে আমার নৌকার সামনে দিয়ে নাড়াচাড়া করছে।

আমি তাড়াতাড়ি নৌকা সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু মাছটা দ্রুত করে সামনে দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি আরো গতি বাড়াতে থাকি ..

চলবে __

গল্প: মরাখলা খাল (ভৌতিক ঘঠনা অবলম্বনে)
পর্ব: ১ম পর্ব
লেখক: SM Rony Chowdhury

Leave a Comment